Wednesday, May 9, 2012

মেধাবীদের ছড়াছড়ি শহরকেন্দ্রিক

এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষায় ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে মোট জিপিএ-৫ পেয়েছে ২৫ হাজার ৬২৯ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ১৫ হাজার ৩৬৮ জনই ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী। বোর্ডের আওতাভুক্ত ঢাকা মহানগরের বাইরে ১৭ জেলা মিলে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১০ হাজার ২৬১ মেধাবী।

অন্য শিক্ষা বোর্ডগুলোতেও শহরের শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করেছে। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রশিক্ষিত শিক্ষকসহ শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা যেসব সুযোগ-সুবিধা পায় তা গ্রামে অনুপস্থিত। যে কারণে গ্রামের শিক্ষার্থীরা শহরের তুলনায় পিছিয়ে আছে। মেধার দৌড়ে গ্রামের শিক্ষার্থীদের এতটা পিছিয়ে থাকার কারণ অনুসন্ধান করে গ্রাম ও শহরের ব্যবধান ঘুচিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে তাঁরা মত দিয়েছেন।
গত সোমবার প্রকাশিত আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডের এসএসসি, দাখিল ও এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় এবার পাসের হার এবং জিপিএ-৫ দুটিই বেড়েছে। সব বোর্ডে গড় পাসের ৮৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ। আর জিপিএ-৫ পেয়েছে ৮২ হাজার ২১২ জন। শুধু এসএসসিতেই পাসের হার ৮৬ দশমিক ৩২ শতাংশ ও জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬৫ হাজার ২৫২ জন। শ্রেণীভিত্তিক ফল উঠে যাওয়ার পর জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মেধাবী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এবারের ফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই মেধাবীদের মধ্যে সিংহভাগই শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। ঢাকা বোর্ডের ফলাফলের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে মোট জিপিএ-৫ পাওয়া ২৫ হাজার ৬২৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৫ হাজার ৩৬৮ জনই ঢাকা মহানগরের। অথচ এই বোর্ডেরই অধীন শরীয়তপুর জেলায় জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ১০৬ জন। পার্শ্ববর্তী মাদারীপুরে ২০৫ জন, রাজবাড়ীতে ২৩৫ জন, গোপালগঞ্জে ২০০ জন এবং ফরিদপুরে ৩৫৩ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। এই বোর্ডের অধীন ১৭টি জেলার মধ্যে ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও গাজীপুর জেলা বাদে বাকিগুলোতে প্রায় একই অবস্থা। ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল শিক্ষার দিক দিয়ে বরাবরই ভালো। শিক্ষার সুযোগ-সুবিধাও এখানে বেশি। এ ক্ষেত্রে ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা হিসেবে নারায়ণগঞ্জও কিছুটা এগিয়ে। এগুলোর মধ্যেও শহরের প্রতিষ্ঠানেই বেশি জিপিএ-৫ পেয়েছে। বাকি জেলাগুলোর অবস্থাও খুব ভালো নয়।
অন্য বোর্ডগুলোতেও প্রায় একই চিত্র। জিপিএ-৫ বেশি পাওয়ার পাশাপাশি সেরা হওয়া বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের ওই সব জেলা সদরে অবস্থান করছে। চট্টগ্রাম বোর্ডে সেরা ২০ তালিকায় ১৪ ও ১৫তম বাদে বাকি সবগুলোই চট্টগ্রাম জেলায় অবস্থিত। এগুলোর বেশির ভাগই আবার চট্টগ্রাম সদরে অবস্থিত। সিলেটে সেরা বিশের মধ্যে প্রথম থেকে পঞ্চম পর্যন্ত সিলেটে অবস্থিত। অন্য বোর্ডগুলোর চিত্রও প্রায় একই।
ভালো ফল ছাড়াও পাসের হার পর্যালোচনা করলেও একই ধরনের চিত্র ফুটে উঠেছে। ঢাকা মহানগরে যেখানে পাসের হার ৯৪ শতাংশ, সেখানে ফরিদপুর, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলায় পাসের হার ৮০ শতাংশের কম বা সামান্য বেশি। অবশ্য সংখ্যার দিক দিয়ে এসব জেলায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ঢাকার চেয়েও কম।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ফাহিমা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, কিশোরগঞ্জসহ কয়েকটি জেলার কারণেই তাঁদের বোর্ডের ফলাফল প্রত্যাশার চেয়ে একটু কম হয়েছে। ওই সব জেলার ফল আরেকটু ভালো হলে সামগ্রিক পাসের হারে এর প্রভাব পড়ত।
গ্রামের শিক্ষার্থীরা মেধার দৌড়ে পিছিয়ে থাকার কারণ জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, প্রধান কারণ গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব। যাঁরা শিক্ষকতায় নিজেকে উন্নত করতে চান, তাঁরা গ্রামে উৎসাহ পান না। এ জন্য গ্রামের শিক্ষার্থীরা ভালো শিক্ষা পায় না। এ জন্য ফলও খুব একটা ভালো হয় না। অথচ একসময় গ্রামে যেমন ভালো শিক্ষক ছিলেন, ফলও ভালো হতো। আরেকটি কারণ হলো, শিক্ষার জন্য বর্তমানে শহরে যে সুযোগ-সুবিধা; সেটা গ্রামে নেই। শহরের অভিভাবকদের মতো গ্রামের অভিভাবকেরা অতটা সচেতন নয়। তিনি মনে করেন, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সমান সুযোগ রেখে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা এবং সে অনুযায়ী বিনিয়োগ করতে হবে।

সূত্র: প্রথমআলো.কম, 09/05/2012

No comments:

Post a Comment